Gmail! | Yahoo! | Facbook | Bangla Font
প্রচ্ছদ / নারী / ভাষা সংগ্রামে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরও অগ্রণী ভূমিকা ছিল : ভাষা সৈনিক রওশন আরা
ভাষা সংগ্রামে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরও অগ্রণী ভূমিকা ছিল : ভাষা সৈনিক রওশন আরা

ভাষা সংগ্রামে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরও অগ্রণী ভূমিকা ছিল : ভাষা সৈনিক রওশন আরা

বিশেষ প্রতিবেদন, সবুজবাংলা২৪ডটকম (ঢাকা) : মৌলভীবাজারের কুলাউড়া পৌর শহরের উছলাপাড়ায় ১৯৩২ সালের ১৭ ডিসেম্বর ভাষা সংগ্রামী রওশন আরা (বাচ্চু) জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই পরাধীনতার গ্লানি তাকে কুরে কুরে খেতো। তিনি পরিবারের সদস্যদের মুখে শুনেছেন ব্রিটিশদের শোষণ-বঞ্চনার কথা। সেই সাথে শুনেছেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কথাও। আর বাড়িতে মায়ের কণ্ঠে মাঝে-মধ্যেই শুনতেন ‘একবার বিদায় দে-মা ঘুরে আসি’ এ গানটি। সেই থেকেই তার মনে স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়ার একটা প্রবল ইচ্ছা তৈরি হয়েছিল।

অত্যন্ত রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ের এ রকম ইচ্ছা মনে পোষণ করা সে সময় রীতিমতো অপরাধ ছিল। মাত্র ৯ বছর বয়সে তাঁকে শিলং পাঠিয়ে দেয়া হয় লেখাপড়া করার জন্য। তাঁর চাচা ছিলেন তৎকালীন কংগ্রেসের একজন সক্রীয় কর্মী। আর দাদা ছিলেন ব্রিটিশদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

রওশন আরা গ্রাজুয়েশনের জন্য ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়তেন দর্শন বিভাগে। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। থাকতেন ঢাবি’র ওমেন্স রেসিডেন্সে, বর্তমানে এটি এখন রোকেয়া হল। পারিবারিক এবং দাদা-চাচার রাজনৈতিক আবহে তিনি নিজের ভেতরে যে প্রতিবাদের বীজ রোপণ করেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পর সেটি আরও প্রবল আকার ধারণ করেছিল। নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

দেশ বিভাগের পর তিনি বুঝতে পারেন, পশ্চিম পাকিস্তানিরা শাসক আর আমরা পূর্ব পাকিস্তানিরা শোষিত। তাদের সঙ্গে আমাদের অনেক কিছুতেই মিল নেই। তিনি বলেন, এমনিতেই সে সময় আমরা সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে খুব একটা শক্তিশালী ছিলাম না। আর সেই সঙ্গে যদি আমাদের রাষ্ট্র ভাষা উর্দু হয়ে যায় তাহলে আমাদের জাতি হিসেবে অস্তিত্ব থাকবে না। সেই উপলব্ধি থেকেই সবার সঙ্গে আন্দোলনে যাওয়া।

রওশন আরা বাচ্চু স্মৃতিচারণ করে বলেন, তৎকালে ছেলেদের সঙ্গে আন্দোলন তো দূরের কথা, লেখাপড়ার নোট নেয়া কিংবা পথে-ঘাটে কথা বলাও নিষিদ্ধ ছিলো। কেউ এ রকম করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে ১০ টাকা জরিমানা করা হতো। এমনকি হুমকি ছিলো ছাত্রত্ব বাতিলেরও। ওমেন্স রেসিডেন্সে সে সময় ছাত্রীসংখ্যা ছিল অনেক কম। সকল ছাত্রী বিভিন্ন হলের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। আমি ছিলাম স্যার সলিমুল্লাহ হলের সঙ্গে। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ইউনিয়নের একজন সদস্যও ছিলাম আমি। সে সময় থেকেই সলিমুল্লাহ হল রাজনৈতিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো।

তিনি বলেন, সবাই মিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় মিটিং করেছি আন্দোলন-কর্মসূচি ঠিক করার জন্য। তখন আমাদের সবার মনে হয়েছিল যে, শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এ আন্দোলন করলে খুব বেশি তা জোরদার হবে না। প্রয়োজন আরও বেশি মানুষ এ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। সে লক্ষ্যেই যার যার যেখানে পরিচিত আছে সেখানে তারা জানাতে লাগলেন। এছাড়া নিজে স্কুল-কলেজের অনেক শিক্ষার্থীকে বুঝিয়ে এ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। ৪ ফেব্রুয়ারির পর থেকে সব জেলায় ও মহকুমায় ভাষা আন্দোলন সর্ম্পকে সচেতনতা তৈরি করা হয়। এ সময় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা অর্থ সংগ্রহে নেমেছিলাম। কারণ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য টাকার প্রয়োজন ছিলো।

রওশন আরা বলেন, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি পাকিস্তান আইন সভায় তোলার জন্য ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি যখন সব প্রস্তুতি আমরা নিয়ে ফেলেছি, তখন জারি করা হয় ১৪৪ ধারা। এটা শুনে আমাদের সকলের মধ্যে শোরগোল পড়ে যায়। সেদিন সবার মুখে একটাই প্রশ্ন ছিল, আমাদের আন্দোলন কি তাহলে ব্যর্থ হয়ে যাবে? একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে আমরা এক এক করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলাম। মিছিলে গুলি চললো। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল তাজা অনেক প্রাণ। আর পরের ঘটনা তো সবার’ই জানা।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে অনেকটা আক্ষেপ করে এই ভাষাসৈনিক বলেন, ৫২’র কথা এলে অনেক সংগ্রামীর নামই আসে। তবে তাদের বেশিরভাগ’ই ছেলে। কিন্তু আমরা মেয়েরা সে সময় কতোটা প্রতিকূল পরিবেশে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিলাম, তা অনেকেই ভুলে গেছেন। ভাষা সংগ্রামে মেয়েদেরও অগ্রণী ভূমিকা ছিল। মেয়ে ভাষা সংগ্রামীদের নাম তেমন একটা উচ্চারিত হয় না বললেই চলে। তাই আমি মনে করি, ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস সঠিকভাবে এ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। ছেলেদের পাশাপাশি আমাদের মেয়ে সংগ্রামী যারা ছিলেন তাদেরও নাম আসা উচিত।

সবুজবাংলা২৪ডটকম/ ঢাকা/ ২৪ মে ২০১৭ /বুধবার/ ১০: ০৫

মন্তব্য

Scroll To Top
Copy Protected by Chetans WP-Copyprotect.