Gmail! | Yahoo! | Facbook | Bangla Font
প্রচ্ছদ / প্রচ্ছদ / কর্তৃপক্ষের তন্দ্রা-নিদ্রা ভাঙবে কবে ?
কর্তৃপক্ষের তন্দ্রা-নিদ্রা ভাঙবে কবে ?

কর্তৃপক্ষের তন্দ্রা-নিদ্রা ভাঙবে কবে ?

রাজু আহমেদ : এক । ভ্রষ্ট বাবার নষ্ট ছেলে সাফাতকান্ডের পর কর্তৃপক্ষ মারফত জাতি জানতে পারলো, আপন জুয়েলার্সের বেআইনি ব্যবসাপত্রের খবর । আপন জুয়েলার্সের বিভিন্ন শোরুম থেকে শুল্ক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সাময়িক জব্দ করা প্রায় ১০০ কোটি টাকা সমমূল্যের স্বর্ণালঙ্কার এখন আইনি হেফাজতে । কর্মকর্তারা হন্যে হয়ে খুঁজছে আপন সত্ত্বাধিকারীর ‘ডার্টি মানি’র উৎস । আপন জুয়েলার্সের প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার পর আবার পূণরায় তা তল্লাসী করা হচ্ছে নতুন কোন ক্লু’র নাগাল পেতে । হোটেল রেইনট্রি কক্ষে দুই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণী ধর্ষিতা হবার পর কর্তৃপক্ষ জাতিকে জানিয়েছে, এ হোটেল কর্তৃপক্ষ মাত্র কয়েক মাসের পরিচালিত ব্যবসায় রাষ্ট্রকে প্রায় ৯ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে । হোটেল অভ্যন্তরে সন্ধান মিলেছে অনুমিতহীন বারের । উদ্ধার হয়েছে অবৈধ মদ । ধর্ষণকান্ড না হলে হয়তো জাতির জানাই হতো না, বৈধতার আড়ালে অবৈধ কার্যকলাপের নামে রাষ্ট্রের পরতে পরতে কতকিছু চলছে ।

নৌ দূর্ঘটনার পর জাতি জানতে পারে, দূর্ঘটনা কবলিত নৌযানটির রূট পারমিট ছিল না । সড়ক দূর্ঘটনার পর জাতিকে গল্পাকারে রসিয়ে রসিয়ে শোনানো হয়, দূর্ঘটনা কবলিত যানটির ফিটনেস ছিল না, নয়তো ড্রাইভারের ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না । ক্লিনিকে চিকিৎসার ভুলে রোগী মারা যাওয়ার পর কর্তৃপক্ষের বরাতে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছিল স্বাস্থ্য সেবার নামের এসব চরম মুনাফালোভী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠান । রোগী মারা যাওয়ার পরে যদি ডাক্তার আসে তবে সে ডাক্তার আগমনে প্রয়োজনীয়তা কতটুকু ? অহরহ ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, জীবনহানী ও মানবিক বিপর্যয় নেমের আসার পরে কর্তৃপক্ষ এসে ডাক-ঢোল পিটিয়ে গোটা জাতিকে জানিয়ে যাচ্ছে, এসব অবৈধ ছিল । ঘটনা ঘটার আগে তারা অবৈধতার খোঁজ করেনি কেন ? তাদের দায়িত্ব কি কেবল লুটেপুটে খাওয়ার পরে যারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তাদেরকে সান্ত্বনা দেয়া নাকি অবৈধতাকে অবৈধভাবে বৈধ করতে যে বিনিময়ের দরকার তা গ্রহন করে চুপ থাকা ? রাষ্ট্রের হাল-চাল আজ বড় হাস্যকৌতুকের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে; নয়কি ?
….
রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে যে সকল কর্তৃপক্ষকে খেটে খাওয়া কৃষক-শ্রমিকের ট্যাক্স-খাজনার টাকায় হাজার হাজার কোটি টাকা বেতন দেয়া হচ্ছে, সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়েছে অবারিত-তারা তাদের দায়িত্ব কতটুকু যথাযথভাবে পালন করছেন ? এসব কর্তৃপক্ষের ওপর নজরদারি করার কর্তৃপক্ষই বা কি করছে ? ব্যথা কি তবে সর্বাঙ্গে…. ! যদি তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করত তবে দূর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর অবৈধতার খোঁজ মিলত না বরং অবৈধতাকে বিচারের জন্য আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করালেই রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের অনাকাঙ্খিত ঘটনাগুলো ঘটার আর সুযোগ থাকতো না । দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, বর্তমানে প্রকৃত সত্যকে জানার জন্য ধর্ষণের মত বর্বরোচিত ঘটনাগুলোর পরিসমাপ্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় । তারপরেই কর্তৃপক্ষের নিদ্রা ভাঙে ! তাই বোধহয় জাতিকে অপেক্ষা করতে হবে, কখন কোন নষ্ট বাবার বখে যাওয়া ছেলে নষ্টামী করবে…. ! তাহলেই আবার আলোয় আসবে অবৈধ কারবারের কিছু গল্প, আমরাও শুনবো !

দুই !

বাংলাদেশের চলমান প্রধানতম সমস্যাগুলোর মধ্যে ধর্ষণ ও ধর্ষণকারীদের উৎপাত দুশ্চিন্তার রেখা একে এঁকে দিচ্ছে সুস্থ্যদের ভালে । পত্রপত্রিকার সংবাদে এ সংক্রান্ত খবরগুলো পড়ে একদিকে যেমন লজ্জায় নুয়ে পড়তে ইচ্ছা করে অন্যদিকে তেমনি আইন প্রয়োগের অসংলগ্নতা দেখে ক্ষোভ জাগে । ধর্ষণের মত ঘটনাগুলো এখন আর রুম কিংবা নির্ধারিত সীমায় আড়াল থাকছে না বরং ভিডিওর দ্বারা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে পৃথিবীর সর্বত্র । একবার ধর্ষণের পরেই এসবের ভিডিও প্রমানের দ্বারা ধর্ষকে শ্রেণীরা বারবার ধর্ষিতা হতে ভিকটিমকে বাধ্য করছে । কোন আব্দারে রাজী না হলেই দেয়া হচ্ছে জীবননাশের হুমকি । আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শিথিলতা এবং দুর্নীতির মানসিকতা সমাজে ধর্ষকের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে । অন্যদিকে কাগজে-কলমের আইনের সমতা বিষয়ক শ্রুতিমধুর বাক্যালাপের অস্তিত্ব থাকলেও আইনের প্রয়োগ ও বিচার বৈষম্যতার কারনে ধর্ষিতারা ন্যায্য বিচার পাচ্ছেন না অথচ কুলাঙ্গার ধর্ষকবৃন্দ ঠিকই আইনের ফাঁক গলিয়ে, অর্থ ও দলের প্রভাব খাটিয়ে সমাজে বুক উঁচিয়ে ঘুরছে । সাফাত-সাদমানদের দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই শিক্ষার্থী ধর্ষিতা হওয়ার সংবাদ আলোতে আসার দু’দিন মাত্র তিন দিন আগে শিশু সন্তান ধর্ষিতা হওয়ার বিচার চাইতে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়ে পিতা তার ধর্ষিতা সন্তানকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার সংবাদ প্রকাশ পেয়েছে । মাত্র সপ্তাখানেকের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় দু’ডজন ধর্ষণের সংবাদ পত্রপত্রিকায় এসেছে । এক মাকে ধর্ষণ করার সময় তা ভিডিওতে ধারণ করে তা প্রকাশের ভয় দেখিয়ে সে মায়ের কন্যাকেও ধর্ষণ করেছে এক কুলাঙ্গার । অথচ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যবৃন্দ এসব ঘটনা নিয়ে ততোটা আগ্রহ দেখায়নি যতটা রেইনট্রি কান্ডে দেখা মিলিছে ।

রেইনট্রি হাটেলে ধর্ষণকান্ডের ঘটনায় গোটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয় । এঘটনায় নিয়োজিত মাঠপর্যায়ের সদস্যদের দায়িত্বে কোনরূপ অবহেলা আছে কিনা তা তদন্ত করতে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা দ্বারা তদন্ত দল গঠন করা হয়েছিল । অথচ দেশের অন্যান্য মেয়েদের ওপর যেসকল ধর্ষণকান্ড ঘটে তার অনেকগুলোর ব্যাপারে গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়, ভিকটিমরা কাঙ্খিত বিচারের দাবীতে তারা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কাছ থেকে ঠিকঠাক সহায়তা পাচ্ছে না । বরং অভিযোগ জানিয়ে তা কর্তৃপক্ষকে বিশ্বাস করাতে পারেনি বলে তাদের থেকে তিরস্কার শুনে আত্মহননের পথ বেছে নেয়াদের সংখ্যাটা নেয়াহেত কম না । একবার শারীরীকভাবে ধর্ষিতা হওয়ার পর বারবার কথার দ্বারা ধর্ষিতা হচ্ছে আমাদের মা-বোনেরা । আইন প্রয়োগের বেলায় যদি এমন বৈষম্য থাকে তবে আদৌ কি ধর্ষণ রোধ করা সম্ভব নাকি এর আরও বিস্তৃতি ঘটবে ?
….
যার যেটুকু দায়িত্ব সে যদি সেটুকু ঠিকঠাক পালন করতো তবে রাষ্ট্রে এমন বিশৃঙ্খলা থাকতো না । জনগনের কষ্টের টাকায় যাদের জীবিকা নির্বাহের নিশ্চয়তা দেয়া হয় তাদের দ্বারা জনগণ কতটুকু সেবার নিরাপত্তা নির্বিঘ্নে পাচ্ছে-এটা রাষ্ট্রের উচ্চতর কর্তৃপক্ষকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে । বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গণমাধ্যম যখন কোন বিষয়কে জাতির কাছে প্রকাশ করে ঠিক তারপরেই দায়িত্বশীলরা তাদের দায়িত্ব ফলাতে শুরু করে অথচ গণমাধ্যমের গোচরে আসার আগেই সেখানে কর্তৃপক্ষের পৌঁছা উচিত ছিল । ঘটনা দূর্ঘটনায় রূপ নেয়ার পর সেখানে কর্তৃপক্ষ গেলে তাতে সমাজ ও রাষ্ট্রের খুব বেশি লাভ হয়না । বরং রাষ্ট্রের মঙ্গল তখনই সার্বিকভাবে নিশ্চিত হবে যখন প্রত্যেক সংশ্লিষ্ট বিষয়ের কর্তৃপক্ষ তাদের ওপরে অর্পিত দায়িত্বগুলো নৈতিকভাবে পালন করবে । আজ বাংলাদেশের কোন সরকারি চাকুরিজীবীর বলার সাধ্য নাই, রাষ্ট্র তাকে যে পারিশ্রমিক দেয় তা জীবিকা নির্বাহের জন্য যথেষ্ট নয় । কাজেই গরীব ও সাধারণ মানুষের কষ্ট-ঘামে আয় করা অর্থ দিয়ে যাদের বেতন দেয়া হচ্ছে, তাদের নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রের কল্যানে সেবার সবটুকু বিনিয়োগ করা । সততা রক্ষা করে দায়িত্ব পালন করা । কর্তৃপক্ষের সততাই কবেল রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গের অসততা দূর করতে সক্ষম; নয়তো গল্প ভিন্ন হবে !
….
রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।
raju69alive@gmail.com

মন্তব্য

Scroll To Top
Copy Protected by Chetans WP-Copyprotect.