Gmail! | Yahoo! | Facbook | Bangla Font
শিরোনাম
প্রচ্ছদ / অর্থনীতি-ব্যবসা / কৃষি / বিষমুক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদনে কালীগঞ্জের এক দম্পতির জৈবসার ও বালাইনাশকের যুদ্ধ !
বিষমুক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদনে কালীগঞ্জের এক দম্পতির জৈবসার ও বালাইনাশকের যুদ্ধ !

বিষমুক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদনে কালীগঞ্জের এক দম্পতির জৈবসার ও বালাইনাশকের যুদ্ধ !

আতিকুর রহমান টুটুল,সবুজবাংলা২৪ডটকম (ঝিনাইদহ) : ফসলী ক্ষেতে ব্যবহৃত কীটনাশক মানবদেহের জন্য ব্যাপক ক্ষতিকর। কীটনাশকআবার ব্যয়বহুলও বটে।  প্রতিনিয়ত ক্ষেতে  কীটনাশক ব্যবহারের কারণে দূষিত হচ্ছে মাটি,পানি,বাতাসসহ আশপাশের পরিবেশ। তাই এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছেন ঝিনাইদহ কালীগঞ্জ উপজেলার মল্লি¬কপুর গ্রামের আশাদুল যুথী দম্পতি। তারা নিজেদের প্রযুক্তিতে বাড়িতে বসেই তৈরী করছেন রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বিকল্প জৈবসার ও বালাইনাশক। যা জমিতে ব্যবহার করে তারা ভাল ফলন পাচ্ছেন। নিজেরা ঘরে তুলে বাজারে বিক্রি করছেন বিষমুক্ত সবজিসহ বিভিন্ন প্রকারের ফসল। এই কৃষক দম্পতির তৈরীকৃত জৈবসার ও বালাইনাশক, ফসলের ভিটামিন ও জৈব সার ক্ষেতে ব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে ভাল ফলন পাচ্ছেন অন্যদিকে খরচ সাশ্রয় করছেন। ফলে এ পদ্ধতিতে চাষ এলাকার কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে।

সরেজমিনে মল্লি¬কপুর  গ্রামে আশাদুলের বাড়িতে দেখা যায়, ঘরের পিছনে মাটি গর্ত করে সারি সারি বসানো হয়েছে বড় বড় মাটির ডিব্বা (আঞ্চলিক ভাষায় কোলা)। এগুলোর মধ্যে তৈরি করা হচ্ছে বালাইনাশক ও জৈব ভিটামিন। ক্ষতিকারক পোকার হাত থেকে ক্ষেতের গাছ বাঁচাতে তারা নিজেরাই তৈরী করছেন বালাইনাশক। পাশাপাশি বিভিন্ন পোকা ও কেচো দিয়ে তৈরী করছেন ভার্মি কম্পোষ্ট।

কৃষক আশাদুল ইসলাম জানান, মাঠে এখন তাদের মাত্র ৩ বিঘা আবাদযোগ্য জমি আছে। যেখানে ফসল ফলিয়ে সারাবছর সংসার চালাতে হয়। আজ থেকে ৫ বছর আগে ১৭ কাঠা জমিতে বেগুনের চাষ করেছিলেন। ক্ষেতে গাছও হয়েছিল ভাল। কিন্তু কিছুদিন পরে পোকার আক্রমণে গাছগুলো দুর্বল হয়ে যায়। বাজার থেকে কীটনাশক কিনে স্প্রে করার কারণে আক্রমন কিছুটা কমলেও সে সময়ে সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারেননি। এভাবে প্রতিনিয়ত ব্যয়বহুল কীটনাশক বাজার থেকে কিনে স্প্রে করায় অতিরিক্ত পয়সা খরচের পাশাপাশি তিনি নিজে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। পরিবারের সকলে তাকে নিয়ে মারাত্মক দুঃচিন্তায় পড়েছিল। বেশ পয়সার ঔষধ সেবনের মাধ্যমে তিনি সুস্থ হয়েছিলেন। এরপর তিনি স্ত্রী যুথির সাথে পরামর্শ করেন অন্য কৃষকদের মত তিনি নিজেও সকালে সবজি ক্ষেতে কীটনাশক ¯েপ্র করে ওই ক্ষেতের সবজিই বিকালে বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন। তারা নিজেরা অনুধাবন করেন কীটনাশক ব্যবহার করা সবজিসহ সকল খাদ্যশস্য প্রতিনিয়ত মানুষ খাচ্ছে ফলে মানবদেহের ক্ষতি হচ্ছে। তারা সিদ্ধান্ত নেন এমন কাজ করবেন না। এরপর কীটনাশকের বিকল্প জৈব বালাইনাশক তৈরীর কথা ভাবতে থাকেন। পরে পরীক্ষামূলকভাবে বাজার থেকে তামাক পাতা কিনে, মাছের আইশ, নিম পাতা এক সাথে চূর্ণ ও রস করে এবং আরো কিছু জিনিস পানিতে মিশিয়ে ছাকনে ছেকে বেগুন গাছে স্প্রে করতে থাকেন। কয়েকদিন ক্ষেতে ব্যবহারের পর পোকার উপদ্রপ কমে যায়। এভাবে পরবর্তীতে তিনি সবজি ক্ষেতে আরো নানা ধরনের পরিবেশ বান্ধব জিনিস দিয়ে বালাইনাশক তৈরী করে  ও ভার্মি কম্পোষ্ট জমিতে ব্যবহার করে ভাল ফলন পাচ্ছেন।

তারা আরো জানান,তাদের দেখাদেখি আরো অনেক কৃষক এখন তার প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে চাষাবাদ শুরু করছেন। প্রথমে গ্রামের অন্য কৃষকেরা গুরুত্ব না দিলেও এখন অনেকেই তাদের নিকট থেকে প্রযুক্তি নিয়ে চাষ করেছেন। এতে তাদের একদিকে অর্থের সাশ্রয় হচ্ছে অন্যদিকে চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ক্ষতিকর কীটনাশকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষায় অবদান রাখছেন। যুথী আশাদুলের আবিষ্কৃত আরেকটি উপাদান হচ্ছে জৈব ভিটামিন।

তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়,গাঁদা ফুল,  দূর্বাঘাস, হাতিশুল গাছ, আগুন জ্বালা গাছ আর পরিমাণ মতো গোচোনা দিয়ে এই ভিটামিন তৈরি করে থাকেন।

তিনি জানান,এই মিশ্রণটি বেশ কিছুদিন রাখা যাবে। যা ফসলে স্প্রে করলে বেশি ফলন পাওয়া যাবে। এছাড়া তিনি যে জৈব বালাইনাশক তৈরী করছেন তাদের দাবি এটা পটল, বেগুন, শিমক্ষেতে ¯েপ্র করলে সব ধরনের পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। এছাড়াও তৈলবীজ জাতীয় ফসল সরিষার শত্রু জাবপোকা দমনে ১০ লিটার পানিতে তামাক পাতার গুড়া,পরিমান মত গোচোনা,কাঁচা পেঁয়াজচূর্ণ মিশিয়ে জৈব বালাইনাশক তৈরি করেছেন।

তারা আরো জানান,মাজরা পোকা দমনে পরিমান মত পানিতে মেহগনি ফল,নিমপাতা ও ছাল, ভাটির পাতা, তামাক পাতা পিষে ও চূর্ণ করে এরমধ্যে গোচোনা মিশিয়ে ছায়াযুক্ত স্থানে পাত্রটির মুখ বেঁধে মাটিতে পুতে রেখে ৩ সপ্তাহ রেখে মাজরা দমনের বালাইনাশক তৈরি করেছেন। যা ক্ষেতে ব্যবহার করে ভাল ফল পাচ্ছেন।

এছাড়াও মাছের আঁইশ দিয়ে তৈরীকৃত বালাইনাশক ক্ষেতে ¯েপ্র করলে ফসল গরু ছাগলে খাবে না। এক ধরনের মোটা পোকা স্থানীয় ভাষায় গুবরেপোকা যা মরা কলাগাছ,সজিনা গাছ কিংবা তালগাছে পাওয়া যায় এ পোকা গোবরের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয় পোকাগুলো গোবর খেযে মলত্যাগ করে। এটা রোদে শুকিয়ে তৈরী করছেন জৈব ফসফেট সার। যা খুব উর্বরাক্ষম।

মল্লিকপুর গ্রামের কৃষক রেজাউল ইসলাম জানান,তাদের গ্রামের কৃষক আশাদুল ও তার স্ত্রী যুথী নিজেদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মাটি, পানি, বাতাস বিশুদ্ধ রাখার যুদ্ধে নেমেছেন। তৈরি করেছেন মাটি ও পরিবেশবান্ধব জৈব বালাইনাশক। এই কৃষক দম্পতি রাসায়নিক ও কীটনাশকের পরিবর্তে যে জৈব বালাইনাশক তৈরী করে বিষমুক্ত ফসল ঘরে তুলছেন তা কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে।

কালীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, রাসায়নিক কীটনাশক মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এ থেকে বাঁচাতে জৈব বালাইনাশক তৈরী করার যে যুদ্ধে নেমেছেন সে জন্য তিনি প্রশংসার দাবিদার।

সবুজবাংলা২৪ডটকম/ ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি / ১৪ জুন ২০১৫ /রবিবার/ ০৬:৫৫

মন্তব্য

Scroll To Top
Copy Protected by Chetans WP-Copyprotect.