Gmail! | Yahoo! | Facbook | Bangla Font
বিজয়ের মাস

বিজয়ের মাস

SB- Bijoy pic

                                                               বিজয়ের মাস

                                                          -জয়নাল আবেদীন বিল্লাল
ণ্টা পড়ার সাথে সাথে মনির স্যার ক্লাসে এসে হাজির। ছাত্র-ছাত্রীরাও একেবারে চুপ। একটুও আওয়াজ নেই ক্লাসে। মনির স্যার খুব ঠা-া মেজাজে টেবিলের মধ্যে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। ছাত্র-ছাত্রীরা মনির স্যারের ভাব নমুনা দেখে একটু অবাকই হলো। যে মনির স্যারকে জানে জ্বলন্ত আগুনের মতো। সেই মনির স্যার আজ বরফ গলা পানির মতো ঠা-া হলো কি করে? ছাত্র-ছাত্রীরা সবাই খুব সাবধানে কানাঘুষা করছে। আজ মনির স্যার এমন হলো কেন? ফোঁস-ফোঁসানি নেই, চোখ ও রাগে বড় হয় না। মনির স্যার হঠাৎ নরম গলায় ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে বললেন, আমার প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা তোমাদের সবাইকে একটা প্রশ্ন করি যারা জানো সুন্দর করে উত্তর দাও। একটুও ভয় পাবে না। আচ্ছা বলতো আমরা কোন মাস অতিক্রম করছি এবং এই মাসে আমাদের একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ দিবস আছে, সেটা কি? সব ছাত্র-ছাত্রী সমস্বরে বলল, স্যার এটা বিজয়ের মাস আমাদের দেশের মুক্তিযোদ্ধারা ১৯৭১ সালে পাকহানাদারের সাথে যুদ্ধ করে ত্রিশলক্ষ শহীদ এবং দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ন’মাস যুদ্ধ করে এই ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে সম্পূর্ণ বিজয় অর্জন করেছিল। তাই আমরা বিজয়ের মাস বলি। মনির স্যার অবাক হয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন। তোমরা দেখি অনেক কিছু জানো মুক্তিযুদ্ধের। আমি খুব খুশি হয়েছি। তোমাদের একটু খুলে বলি, আমাদের দেশের কিছু মীরজাফর, কুলাঙ্গার, রাজাকার, আল-বদর ছিল ওই পাক হানাদারের সাথে। এই দেশীয় মীরজাফররা বিভিন্নভাবে বাংলাদেশের শত্রুদের সাহায্য করেছে পথ চিনিয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয় পাক বাহিনীর কাছে অস্ত্রট্রেনিং নিয়ে আমাদের অনেক লোক হত্যা করেছে। আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। ওদের হৃদয় ও হাত এতটুকুও কাঁপেনি। আমাকে দেখে তোমরা ভাবছ স্যার এত মর্মাহত কেন। তবে শোন সেই করুণ কাহিনী : আমার বয়স আট বছর। ক্লাস থ্রিতে পড়ি। পাকবাহিনী ও দেশীয় দোসরদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল লড়াই চলছে সারা দেশে। মুক্তি বাহিনীর গেরিলা আক্রমণে পাকবাহিনী দিশেহারা হয়ে গেছে। দিনে দিনে একেবারে কাবু ঠিক সেই সময় ওরা দেশীয় দোসরদের নিয়ে আমাদের গ্রাম আক্রমণ করে। গ্রামের নাম লক্ষ্মীনগর। গুলির শব্দে কেঁপে উঠলো পুরো গ্রাম। তখন বাবার বুঝতে দেরি হলো না- ততক্ষণে পাকবাহিনী, রাজাকার আমাদের গ্রাম পুরো ঘিরে ফেলেছে। বাড়ি বাড়ি ঢুকে যাকে পাচ্ছে তাকেই হত্যা করছে। অন্য গ্রামে পালিয়ে যাওয়ার কোন পথ নেই এমন অবস্থায় বাবা আমাদের সবাইকে নিয়ে ঘরের দরজা লাগিয়ে দিলেন। হাতে একটা রাম দা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। চারদিক থেকে গুলির শব্দ আসতে লাগলো গ্রাম জুড়ে কান্নার রোল পড়ে গেল। হঠাৎ আমাদের দরজার সামনে এসে বলতে লাগল, আন্দার কোয়ি হ্যায়? বাবা-মা-বোন সবাই কাঁপতে শুরু করল। বাবা আমাকে বলল মনির তুই চকির নিচে শুয়ে পড়। একদম আওয়াজ করবি না। আমি চকির নিচে এক কোণে মাটির সঙ্গে লেপটে থাকলাম। পাকবাহিনী দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকল, প্রথমেই বাবাকে কোন কথা না বলে ব্রাশ ফায়ার করল। বাবা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুতে শুরু করল। তারপর মাকে গুলি করে। রক্তের বন্যায় ঘর ভেসে গেল আমি চকির নিচ থেকে সব দেখতে পেলাম। অনেক কষ্টে কান্না চেপে রাখলাম আর রক্তে যেন আমার শরীর ডুবিয়ে দিচ্ছে। আমার একমাত্র বোনটিকে হানাদাররা ধরে নিয়ে গেল ওদের ক্যাম্পে। বাবা মার ফিনকি দেয়া রক্তে আমার শরীর স্নাত হয়ে গেল। দিনটি ছিল ২৯ নভেম্বর ১৯৭১। ছাত্রছাত্রীরা মনির স্যারের হৃদয় বিদারক কাহিনী শুনে সবাই চমকে উঠল। প্রশ্ন করল তারপর কি হলো স্যার? ওরা চলে যাওয়ার পরে আমি কাঁপতে কাঁপতে বাইরে আসলাম। এখানে সেখানে পড়ে আছে শুধু লাশ আর লাশ। পরে জেনেছি ১৪৪ জন লোককে সেদিন হত্যা করেছে। রাজাকার, দেশীয় দোসর যারা ছিল। মূল্যবান জিনিসপত্র সব নিয়ে গেল। আমি চুপি চুপি ঘর থেকে বের হয়ে সোজা নানা বাড়ি চলে যাই। বাবা মার লাশ পড়ে রইল ঘরে। আমি কিছুই করতে পারলাম না। আমার বয়স মাত্র ৮ বছর। কি-ইবা করার ছিল আমার? ছাত্র-ছাত্রীরা শুনে সবার চোখের জল নেমে এলো ‘কি পাষ- ছিল কুকুরের বাচ্চাগুলো’ সবাই সমস্বরে বলল। এত বড় গণহত্যা আমাদের এই অঞ্চলে আর হয়নি। পরে জানতে পেরেছি আমার বোনটি ঐ শকুনদের আঁচড় সইতে না পেরে নিজের কাপড় গলায় পেঁচিয়ে ফাঁস দিয়ে মরে গেছে। সেই থেকে আমাদের গ্রামটি বদ্ধভূমি হিসেবে খ্যাত। ষোল ডিসেম্বর আমরা বিজয় পেলাম তখন আমি একদম একা হয়ে গেলাম। নানা বাড়ির সবাই আমার জন্য অস্থির হয়ে গেল। আমার লেখাপড়া নিয়ে বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ল তারা। শেষপর্যন্ত নানা বাড়ি থেকেই লেখাপড়া করতে শুরু করলাম। নানাদের অবস্থা খুব বেশি ভালো ছিল না। অনেক কষ্ট করে আমাকে পড়তে হয়েছে। আমি ক্লাস ফাইভে এবং ক্লাস এইটে বৃত্তি পেয়ে এবং মেট্রিকে স্কলারশিপ পেয়ে সেই টাকায় ভর করে আমি লেখাপড়া করি। বিধাতার অসীম কৃপায় আমি প্রথম শ্রেণীতে ডিগ্রি পাস করি। তারপর আর পড়া হলো না। নানা-নানি মারা গেলে প্রথম গ্রামের একটি স্কুলে চাকরি নেই। তারপর বিয়ে করে বাড়িতে বসবাস শুরু করি। এখন তো তোমাদের স্কুলে শিক্ষকতা করছি। প্রায় ১০ বছর হয়ে গেল। এটা বিজয়ের মাস চলছে। এই মাসটি আমাদের বাঙালি জাতির জীবনে গর্বের মাস। ৩০ লক্ষ জীবন ও ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে পেয়েছি। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিন। ঐ দিন আমরা সব বাঙালি শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শহীদ ভাইদের শ্রদ্ধা জানাব। আমার প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা তোমরাও বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে একাত্তরের চেতনায় শহীদ মিনারে যাবে। ফুল দিবে আর শহীদ ভাইদের জন্য প্রাণ ভরে দোয়া করবে।

মন্তব্য

Scroll To Top
Copy Protected by Chetans WP-Copyprotect.